২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:৩২

লিটন আব্বাস’র ঈদ গল্প ‘ঘর’

পুরোনো একতলা বিল্ডিং ঘরই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কলিমুদ্দিনের! তারপর আবার চলছে মহামারী! ষাটদিন যাবৎ কর্মহীন! বাবা না থাকলেও ঘরে আছে অসুস্থ বয়স্ক মা, লিকলিকা শরীরী শ্যামা রঙা বউ আর সবেধনমণি এক পুত্র, এক কন্যা।

ঘর দেখতে বিল্ডিং সেই ব্রিটিশ আমলের লোহার বীম, চুন সুড়কির উঁচু উঁচু দেওয়ালে আজ জৌলুস নেই। পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে বহুদিন ধরে। বিল্ডিং এর বাইরের চেহারা অতোটা মলিন না হলেও ভেতরের অংশে ভূতুরে এক ব্যাপার বিরাজমান। দিনের বেলায়ও সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌছায়না। কামড়াগুলো বড়ো বড়ো বেশ তাই ছোটছোট ছেলেমেয়ে দুজন ঘরে আরামে দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা করতে পারে।

বলা যায় সুখ সমৃদ্ধি এককালে এদের ছিলো। বাবা কাপড়ের পাইকার ছিলেন। দুধেভাতেই চলতো!

সন্ধ্যা লাগলে কলিমুদ্দিনের বাবার বিল্ডিং ঝকমারী না দেখালেও এক আভিজাত্য আর অহংকার নিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে! বাবার বিল্ডিং দুইচার বছর পর রঙচঙ করাবে সে সামর্থ্য হারিয়েছে আরো আগেই। বাবার ব্যবসা জীবিত থাকা অবস্থায় মন্দায় পড়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আগেকারদিনের ব্যবসায়ীরা সন্তানদের পড়াশোনার চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাতো ব্যবসায় ছেলেটা কতো মনযোগী সেদিকে মনোনিবেশ করাতো কঠোরভাবে। ফলে কলিমুদ্দিনের লেখাপড়া ফাইভ পাসেই শেষ হয়। বাবার ব্যবসা মন্দা অন্যদিকে দেনাদাররা কলিমুদ্দিনের বাবার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে পাওনা টাকাকড়ি আর দেয় না অনেকে।

কলিমুদ্দিন তখন বেশ তরুণ যুবক। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ধাক্কায় সব শেষ!

বাজারের দোকানটা খালি হাতপায়ের মতো কেবল অসহায়ের মতো পরে থাকলো, সেও খেতে দিতে অসুস্থ বাবাকে ওষুদ দিতে ব্যর্থ হলে একটা সময় পাইকার দোকান বিক্রি হয়ে যায়।

সব টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা, খাওয়া দাওয়া খুব বেশিদিন গেলো না। টাকা শেষ, বাবাও!

পিতাহীন কলিমুদ্দিন বাবার বন্ধু, সহযাত্রী ব্যবসায়ীর কাছে ধর্না দিয়ে কিছু কাপড় নিয়ে ফুটপাতে বসে। অচল অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন আসতে থাকে। সেইভাবে কোনরকমে চলে আসছিলো কলিমুদ্দিন।

কিন্তু হঠাৎই কোনো আভাস বা সতর্কবার্তা না দিয়ে বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা ভাইরাসে কাবু করতে থাকে গোটা দুনিয়া। পুরো পৃথিবী আজ থমকে গেছে! কর্মহীন ও কর্মচঞ্চল মানুষ আজ এক কাতারে। কারো কোনো কাজ নেই আজ।

কলিমুদ্দিনও কাজ হারা, খাবারহীন এক বংশীয় বাতেলা। ঘরে ফেরে খালি হাতে। মায়ের ওষুদ নেই। ছেলে মেয়ের ছোট্ট বায়নাও ছুটে গেছে এই দুইমাসে।

তিনবেলা খাওয়ার নেই ঘরে।

এদিকে দরিদ্র, অতিদরিদ্র, ভাসমান মানুষ ত্রাণ পেলেও কলিমুদ্দিনের নাম নেই কোনো তালিকায়। সে তো এককালের বংশীয় বড়লোক, বাবা দাদার নাম ডাক ছিলো!

বাড়িতে বিল্ডিং! তার আবার সামান্য খাওয়ার কোনো সমস্যা আছে এই ভাবনা কারো মাথায় আসেনা। সবাই ছোটে ভাঙাচেরা ঘরের দিকে, সব খাদ্য সেদিকেই ছোটে। কলিমুদ্দিনের ঘর পার হয়ে এবাড়ি, ওবাড়ি, পাড়াময় করে বেড়ায় ত্রাণ কিন্তু কলিমুদ্দিবের ক্ষুধার্ত মুখ কারো নজরে পড়ে না!

দুদিন ছেলেমেয়ে দু’জন ছাড়া সংসারে সবাই প্রায় না খাওয়া! পাশের বাড়ি থেকে ধার করা কয় কেজি চালে চলছিল ভর্তাভার্তি করে।

এমনিতেই ঘরে চাল নেই। তারপর ছোট্ট মেয়ে ক্লাস থ্রীতে পড়া নূরজাহানের বায়না।

-বাবা, এই গরমে সবাই তরমুজ খাচ্ছে।

আমরা খাচ্ছি না ক্যান! আমার তরমুজ খাতি খুব মন চায় ছে।

ও বাবা,

তুমি আজই ইফতারের আগে নিয়ে আসপা।

কলিমুদ্দিনের চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে। ঠিকঠাক ইফতার, সেহরী হচ্ছেনা তারপর মেয়ের এই বায়নায় বারুদে কলিমুদ্দিন হনহন করে কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো!

ও মা, বাবা কী তরমুজ আনবিনি আইজ!

মায়ের চোখের জল দুমাসেই ফুরিয়ে গেছে। এর আগে কোনদিন এতোটা ক্ষুধার কষ্ট করেনি।

কদিনপরই ঈদুল ফিতর।

ছেলে মেয়ে আবার কী বায়না করে। ষাক লকডাউনের ভেতর কদিন দোকানপাট চললেও বন্ধ হয়ে একদিকে ভালোই হয়ছে। বলা যাবে জামা কাপড়ের দোকান বন্ধ।

এর মধ্যে আদুরে কন্যা বাবাকে বলে রেখেছিলো সুন্দর একটা ড্রেস সে এবারের ঈদে নেবে। ছেলেটাও বলেছিল তবে সে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ায় কিছুটা বুঝতে পারে বলেই বায়নার আব্দার সে করেনা এখন। এটুকুও বোঝে সে, বাবা মা না খেয়ে ওদেরকে খাওয়াচ্ছে। একধরনের চাপাকষ্ট নিয়েই ছেলেটা বিকেল হলে পাড়ার মাঠে ওর বয়সি, ওরচেয়ে বড় বড় ছেলেদের ঘুড়ি ওড়ানো দেখে ভীষণ আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরে বটে।

ঘরে ঢুকলেই ঘরময় ক্ষুধার তাড়ণায় নিশপিশ করতে থাকে।

মেয়েটা আবারো বলে,

ও মা কও না ক্যা?

বাবা কি তরমুজ আনবিনি?

মায়ের মন ভেতরে হুহু করে ওঠে, মেয়েটাকে শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে বলে,

– হ, আনবিনি!

মেয়েটা তরমুজ খাওয়ার আশা নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে পরপর কয়দিন!

এভাবে একদিন দুদিন করতে করতে ঈদ চলেই আসলো বাড়ির দৌড়গোরে! জামাকাপড়ের বায়না সে তো দোকানপাট বন্ধ বলে থামানো গেছে।

কিন্তু মেয়ের সামান্য একটা তরমুজ। একশ টাকার কম নয়। কী করে কলিমুদ্দিন মেয়েকে বুঝ দেবে।

দোকানপাট বন্ধ হলে অনেকে শাটার বন্ধ করে ভেতরে সরগরম থাকে।

কিন্তু কলিমুদ্দিন থাকেই ফুটপাতে ওরতো অন্দরমোহল নেই! তাই দুইচারখানা লুঙ্গি, গামছাও বিক্রি নাই।

কালকে ঈদ।

মেয়ের বায়নার কাছে হার মেনে ঘর থেকে কয়েকটা লুঙ্গি, গামছা নিয়ে বের হয়।

বউ বলে,

-এই রাত্রিরি তুমি এসব নিয়ে কনে যাচ্চো?

মেয়ে বলে,

বাবা তরমুজ আনতে যাচ্চে!!

কলিমুদ্দিনের মা পাশের ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে,

–কলিম ব্যটা, আমার প্রেসারের বড়ি নাই আজ কয়দিন। মাতাডা, ঘাড়ডা ধরে আসতেচে।

কয়ডা বড়ি আনেতো বাজান!’

কলিমুদ্দিন কোনো কথা না বলে চোখ মুছতে মুছতে চাঁদরাতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।

পাড়াময় আগেরকার ঈদের মতো জৌলুস না ছড়ালেও চাঁদরাতের আকাশজুড়ে শুধু ঘুড়ির মেলা ঘুরছে। কলিমুূদ্দিনের ছেলেটা! তা দেখেই যেনো তৃপ্তি!

কলিমুদ্দিন বাবার ভিটে ছেড়ে সরু রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে। পাকা রাস্তায় ওঠার আগে ধপ করে বসে পড়ে আলের উপর।

ভাবছে এই লুঙ্গি, গামছা কোথায় বিক্রি করে মেয়ের জন্য তরমুজ, আর মায়ের ওষুদ কিনবে। বাঁকীর দোকানগুলো আর দিতে চায়না সবজি, চাল, ডাল আর ওষুদের দোকানদারের তাগাদা দেড়মাস চলছে। তাদের সামনে গেলেই আজ বিপদ।

কী করবে কলিমুদ্দিন!

মাঠজুড়ে বহু মানুষের আনন্দ আকাশে ওড়াউড়ি করছে কিন্তু কলিমুদ্দিনের মনের কষ্ট কিছুতেই থামছে না।

একটা বিল্ডিং ঘরই এই সংকটময় সময়ে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয়ে গেছে। কোনো একজন মানুষ একবারও খোঁজ নিলো না, কলিমুদ্দিন কেমন আছে, কেমন চলছে তার সংসার!

কালকে ঈদ। বাজারসদাই করেছে কিনা কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেনি।

অথচ এই মাঠে যারা ওরচেয়েও গরিব তারাও আজ এই আনন্দ আকাশে শরীক হয়েছে।

তারাও ঈদে সেমাই চিনি, চাল, ডাল, তেল, আলু, মসলা পেয়েছে, কিন্তু কলিমুদ্দিনের সেমাই চিনি দূরের কথা একটা তরমুজ আর কয়টা ট্যাবলেট নিয়ে যে বাড়ি ফিরবে সে ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত হলো না!

কলিমুদ্দিন আকাশের দিকে চেয়ে বলে ওঠে,

-আল্লাহ আমার এই একটা ঘর কী কাল হয়া গেলো! আজ দুডে মাস কাম নাই, ইনকাম নাই! কেউতো আমারে কিছু দিলে না!

-হে আল্লাহ হয় তুমি আমার এই বিল্ডিং ঘর তুলে নাও, না হলি আমার এইকডা কাপুর বেচার ব্যবস্থা করে দাও।

কাঁদতে থাকে কলিমুদ্দিন…!

( সম্পাদনায়:অনলাইন নিউজরুম এডিটর )

%d bloggers like this: