২৮শে নভেম্বর, ২০২০ ইং | ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | সকাল ১১:৩১

হ্যান্ড স্যানিটাইজার যখন ক্ষতির কারণ

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ডেস্ক (কৃষি কণ্ঠ অনলাইন সংস্করণ) ।। কোভিড-১৯ মহামারির এই দুঃসময়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের ধুম পড়েছে। নিজেকে করোনাভাইরাস থেকে দূরে রাখতে বাধ্য হয়েই সাবান পানি বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছি আমরা।

সাবান পানির বিকল্প হিসেবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভালো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারে। তবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার অতিরিক্ত ব্যবহারে এতে থাকা অ্যালকোহলের কারণে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার কি?: হয়তো আপনি আগে থেকেই জানেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার কি কাজ করে। তবে যারা নতুন করে এর সাথে পরিচিত হচ্ছেন, তাদের জন্য বলতে হয়- সাবান পানির বিকল্প হিসেবে পকেটে নিয়ে বাইরে যাওয়া যায়, বাজারে ছোট কৌটায় পূর্ণ যে জীবাণুনাশক পাওয়া যায়, তা হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আশেপাশে পানি না থাকলেও এই জীবাণুনাশক হাতে নিয়ে মাখলে অনেকাংশেই নিরাপদ থাকা যায়। দু’ ধরনের হয় এটি- অ্যালকোহল সমৃদ্ধ ও নন অ্যালকোহল। যে স্যানিটাইজারটি নন অ্যালকোহলিক, তাতে প্রধান উপাদান থাকে বেনজালকোনিয়াম ক্লোরাইড, এই উপাদান আগুন ধরায় না এবং এটি নন টক্সিক। তবে পরীক্ষায় দেখা গেছে, নন অ্যালকোহলিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার জীবাণু ধ্বংস করতে খুব একটা কার্যকর না।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য কর্মীরা সহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষ অ্যালকোহল সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজারকেই বেছে নেন। এতে আইসোপ্রোপেনল, এন-প্রোপেনল, ইথানল বা এগুলোর যেকোনো দুটি উপাদানের সংমিশ্রণ থাকে। সাধারণত এই ধরনের হ্যান্ড স্যানিটাইজার জীবাণু ধ্বংসের জন্য ৬০-৮৫ শতাংশ ইথানল সমৃদ্ধ হয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করার ফলে হাতে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে না ও সংক্রমণ কমায়। এটি রোগীদের মাঝে সংক্রমণ কমিয়ে মৃত্যুর হার কমায়। ওই গবেষণায় এ তথ্য জানা গেছে যে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করার কারণে ১.৪ মিলিয়ন মানুষ জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।

যে কারণে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ক্ষতিকর: অ্যালকোহল ছাড়াও হ্যান্ড স্যানিটাইজারে আরো একটি উপাদান থাকে, এর নাম ট্রাইকলোসান বা টিসিএস। এটি একটি অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি ফাঙ্গাল উপাদান যা সাবান, টুথপেস্ট, ডিওডোরেন্ট ও স্কিন ক্রিম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। যদিও এটি জীবাণু ধ্বংসে কার্যকর, তবে প্রতিদিন স্যানিটাইজার বেশি ব্যবহার করলে এই উপাদান ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

স্যানিটাইজার আগুন ধরায়: বেশিরভাগ স্যানিটাইজারে জীবাণু ধ্বংস করতে ইথানল বা ইথাইল অ্যালকোহল থাকে প্রচুর পরিমাণে। ইথাইল অ্যালকোহল আগুনে দাহ্য তরল। তাই দুর্ঘটনাক্রমে স্যানিটাইজার আগুনের সান্নিধ্যে আসলে, তাতে আগুন ধরে যায়। তাই আমেরিকার অকুপেশনাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছে-

* স্যানিটাইজার ব্যবহারের আগে আপনার আশে পাশে আগুনের সূত্রপাত ঘটাতে পারে এমন কিছু নেই, তা নিশ্চিত হোন।

* যদি ঘর বা অফিসের কোথাও কৌটা থেকে স্যানিটাইজার পড়ে যায়, তাহলে তা দ্রুত পানি দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।

* ঘরে যেখানে কম উত্তাপ থাকে, সেখানে স্যানিটাইজার রাখতে হবে। বিদ্যুতের সংযোগ, সুইচ এসবের কাছে রাখা ঠিক না।

* বড়দের সঠিক তত্ত্বাবধানেই শিশুদের হাতে স্যানিটাইজার দেয়া উচিত।
ত্বকে স্যানিটাইজারের বিরূপ প্রভাব: ‘এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারন্যাশনাল’ নামের জার্নালে প্রকাশ হওয়া এক গবেষণায় জানা গেছে, এক নাগাড়ে ৩০ দিন স্যানিটাইজার হাতে ব্যবহার করলে তাতে ব্যাকটেরিয়ার রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। অর্থাৎ এরপর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস নাও হতে পারে। এছাড়া একটানা স্যানিটাইজার ব্যবহারের ফলে ত্বকে বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার যেসব ক্ষতি করতে পারে, সে সম্পর্কে জানিয়েছে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।

* স্যানিটাইজারের ক্যামিকেল ত্বকে জ্বালা পোড়ার অনুভূতি দিতে পারে, চুলকানিও দেখা দিতে পারে স্যানিটাইজারের কারণে।

* অতিরিক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহারের ফলে ত্বকের উপরিভাগ শুষ্ক হয়ে উঠতে পারে।

* এক পর্যায়ে সূর্যের আলোতে ত্বক ঝলসে যাওয়ার অনুভূতি দিতে পারে স্যানিটাইজার।

* স্যানিটাইজারে থাকা ট্রাইকলোসান আপনার ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করে রক্তের সাথে মিশে যেতে পারে, যাতে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।

* অতিরিক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহারে শরীরের অন্য কোনো জায়গায় সংক্রমণ ঠেকাতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

* খাওয়ার পর আপনার হাতে যে চিনি বা চর্বি লেগে থাকে, তা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে পারে না স্যানিটাইজার। এতে করে সেসব চিনি বা চর্বি মুখমন্ডল ও চোখে প্রবেশ করে সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।

আরো যেসব ক্ষতি হতে পারে:

* ভুল করে স্যানিটাইজার মুখে দিলে শিশুদের শরীরে অ্যালকোহল পয়জনিং হতে পারে।

* স্যানিটাইজার বেশি ব্যবহার করলে শরীরে হরমোনের তারতম্য দেখা দিতে পারে।

* স্যানিটাইজারে থাকা কেমিক্যাল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বাধা দিতে পারে।

* স্যানিটাইজারে থাকা সিনথ্যাটিক উপাদানে যেসব কেমিক্যাল থাকে, তা মানুষের শরীরে জিনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

তথ্যসূত্র: বোল্ড স্কাই

( সম্পাদনায়:অনলাইন নিউজরুম এডিটর )

%d bloggers like this: